কবি জাহাংগীর খান ও তার জলের পদাবলি
কবি জাহাংগীর খান ও তার জলের পদাবলি
-অবিনাশ চন্দ্র বিশ্বাস
শিক্ষক,কৃষ্ণনগর উচ্চ বিদ্যালয়।
সহজ সরল কথায় গুরুত্বপূর্ণ কথার গুরুগম্ভীর উপস্থাপন কবি জাহাংগীর খানের বিশেষ সকীয়তা। দীর্ঘদিন এই নির্ভৃতচারী কবি তার বক্তব্যকে বিভিন্নভাবে প্রাঞ্জল অথচ তীর্যক-ব্যাঙ্গাত্মক আশ্লেষে প্রকাশ করে ইতোমধ্যেই সমাদৃত হয়েছেন। কবিতায় অধ্যাত্মবাদকে চটুল ছন্দের ঘোড়ায় চড়িয়ে পাঠকের দোর গোড়ায় পৌঁছে দেবার ব্রতচারী কবি জাহাংগীরখান এর জলের পদাবলী তারই ধারাবাহিকতা।
জলের পদাবলী একটি বহুমাত্রিক রসপাত্র যা প্রার্থনা কবিতার প্রস্রবনের মাধ্যমে পূর্ণ হতে হতে মিছেমিছি কবিতার দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। কবি জাহাঙ্গীর খান একজন ব্রাত্য কবি। তাই তার কাছে আমরা সব সময় চিরায়ত দর্শনের উত্যুঙ্গ ভূমার ঈঙ্গিত পাই। প্রচলিত ভাবের আবহে তিনি যে, গুঢ় রসের আস্বাদ আমাদের দেন তার উৎস তার বোধের গভীরতা। যেখানকার অধিকারী তিনি নিজেই।
প্রতিকী কথা কাব্যের অপরিহার্য সম্পদ। কবিকে অবশ্যই সেই সম্পদের সীমায় পৌঁছতে হয়। যার কারনে কাব্য হয়ে উঠে ধরা-অধরার রূপালী চাঁদের মহিমা। জলের পদাবলী তেমনি একটি রসধারার ছলছলানি।
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ মধ্যরাতের পদ্যের মত এই কাব্যেও তিনি প্রার্থনা নামক প্রবেশ-তোরণ কবিতা রেখেছেন। যার মধ্যে দিয়ে এই কাব্যের মহিমাময় লীলায়িত জগতে প্রবেশ করতে করতে পাঠক অনির্বচনীয় কথার তুরীয় মার্গ সামনে পাবেন। সেখানে পাঠক শুনতে পাবেন ব্রজের বাঁশির সুর, নৃত্যগীতের নিক্কণ, নীল যমুনার রস কেলির উচ্ছ্বাস, কুলবধুর শিকল ভাঙ্গার গান। আর এ সবই বলেছেন কবি ‘সেয়ান চোখের ঈঙ্গিতে’(মধ্যেরাতের পদ্যে)।
যাপিত জীবনের অনভিজ্ঞতার ভয়াবহতা জীবনকে ক্ষয়িঞ্চু ও ভঙ্গুর করে তোলে। যার থেকে উত্তোরনের আকাঙ্খা কবির প্রার্থনা কবিতায় আর্তির মত শোনায়। ‘বাতাস যেন বহেনা জোড়ে, ফুলেরা যেন ঝরে না পড়ে’ দুইটি চরনের মধ্যে জীবনের গভীরতম দর্শনের সংকেত। কথা যত বেশি প্রতিকী হয়ে ওঠে তার অর্থ দেবার ক্ষমতা তত বেশি তীব্র হয়, -তা তত বেশি বহুমাত্রিক অর্থদ্যোতনায় সমৃদ্ধ হয়। প্রার্থনা কবিতায় তিনি তার বক্তব্যের পুরটাই বলেছেন অনেক কম বলে। যা কবির সৃষ্টিশীলতার অমিয় স্বাক্ষর।
সম্পর্ক প্রকৃতির একটি অবধারিত আকর্ষনের নাম। যা বিশ্ব সংসারে সুশৃঙ্খল বিন্যাসের আবর্তে শৃংখলিত করে রেখেছেন। যার ব্যত্যয় যে কোন অসামঞ্জস্যতার দূর্ভোগকে ত্বরান্বিত করে। এটা একটা প্রাকৃতিক বিধি সম্পর্ক, কোন চাপিয়ে দেবার নয়। যদি তা হয় তাহলে সেটা চাপ হয় কারো না কারোর উপর। ‘সম্পর্ক নয় চাপের, সম্পর্কটা নিচের নয়, অনেক উচ্চ ধাপের’। জীবনের অস্থির টানাপোড়েন, অমিমাংসিত কামনা বাসনা মানুষের সম্পর্কের কোমল ভূমিকে কঠোর ও জটিল করে তুলেছে। তাই মানুষ দিনদিন জীবনের মানে খুঁজে পাচ্ছে না। সম্পর্ক কবিতায় কবির সর্ম্পক সম্পর্কে ইঙ্গিত পূর্ন অর্থবহ বাণী- ‘উপর উপর হয় না প্রেম, সম্পর্কটা তলের’। সম্পর্ক সত্যিই যদি সুসম্পর্ক হয় তাহলে সেখানে অসাধ্য ফল ফলে।
“সম্পর্কটা বাঘের পিঠে চড়ার
সম্পর্কটা নরক বিজয় করার”
কবি জাহাংগীর খানের জীবন দৃষ্টি অন্তর্মুখী। তাই বহিরঙ্গ কথার ছলে জীবনের গভীর বোধের সংবাদ তার সম্পর্ক কবিতাটিকে আস্বাদ্য করে তুলেছে।
জল বিষয়ক লেখা কবি জাহাংগীর খানের সমগ্র কাব্যসত্তার একটি জ্বলজ্বলে বিষয়। জল জীবনের প্রতীক। জলই জীবন। যেহেতু, জীবন স্রোতস্বিনী। তাই, এর প্রবাহমানতা যে জীবনের গতিময়তা তা কবি তার জলের পদাবলিতে খেলিয়েছেন । শুধু জলের পদাবলি কাব্যই নয় তার মধ্যরাতের পদ্যও একটি জলীয় কাব্য। তিনি আসলে জীবন বলতে জলকে বোঝাতে চেয়েছেন। তাই তিনি তার কাব্য-রস-তরীকে জলের উপর ভাসিয়েছেন। তার সমগ্র কাব্য মাধুর্য্য ঐ রসতরীর দোলারই বাঙময় ব্যাঞ্জনা। যার বলার ঢং মধ্যযুগীয় এবং চলার ঢং বৃন্দাবনী।
তিনি তার জলের পদাবলির প্রার্থনা কবিতাতেই জল শব্দটা ব্যবহার করেছেন। এমনকি মধ্যেরাতের পদ্য কাব্যের প্রার্থনা কবিতাতেও। জলকেই প্রধান করে কাব্যে বলবার চেষ্টা করেছেন। এটা কবির রসিক মনের আনন্দ লীলা। তাই কবির জলের পদাবলি একটি জীবন গাঁথা। শাশ্বতের ঁেখাজে অভিযাত্রী কবি চিন্তায় ও চেতনায় চিরায়তবাদী। আর জলের পদাবলি কবির সেই মানস রসের উচ্ছ্বাস।
এই কাব্যের শিরোনাম কবিতা “জলের পদাবলী” কবিতাটি শুরুই করেছেন তিনি এভাবে-
শীতল ছিল, নিটোল ছিল, স্বচ্ছ ছিল জল
উষ্ণ হল,ঘোলা হলো,হল যে চঞ্চল।
স্বচ্ছ-শীতল-নিটোল জলেই শুধু জীবনের গভীরতম প্রদেশের প্রতিফলন ঘটে। জীবন যখন শান্ত- স্বচ্ছ সলীলা হয় তখন জীবন জীবনপূর্ন হয়ে উঠে। সেই জীবন প্রবাহিনীতে মাতাল হাওয়ায় যখন প্রবল ঢেউ উঠে তখন আর সেখানে কাঙ্খিত প্রতিচ্ছবি প্রতিবিম্বিত হয় না। তাই কবির এখানকার কথাগুলো কেমন উপদেশ বানীর মত শোনায়।-
বাতাস বুঝে তুলিস তবে পাল
নিপুন হাতে ধরিস কষে হাল
রাখিস ঢেউয়ের তালে তাল।
কবি জাহাংগীর খান একজন বৈষ্ণব কবি। বৈষ্ণবীয় দৃষ্টিভঙ্গি কবিকে স্ববোধে নিমগ্ন করেছে। তার কবিতা গুলো নিছক কাব্যরসলীলার আস্বাদন নয়, এটা জাগতিক জীবনের ত্রি-তাপের গল্প নয়, এটা জীবনের অন্তর্যাত্রার অমিয়কথন। প্রথাবদ্ধ সংস্কারাচ্ছন্ন ব্যবস্থপনার বাইরে ‘অগ্নিঝলকে, ব্রজের বালকে’র আঁধারে পথ চলার গল্প।
গোপনীয়তা আমাদের জীবনের এক অলিখিত অধ্যায়। মানুষের জীবনে প্রকাশ্যে যা ঘটে তার চেয়ে অনেক অনেক গুন বেশি ঘটনা ঘটে তার গোপনে। সেটা অনেকের কাছে গোপনই থেকে যায় যা সে টের পায় না। মানুষের এই মনোজগতের গোপন বেচাকেনার গোপন কথার গোপন রহস্য-কথা তার “ জলের পদাবলি” সিরিজের ৪নং কবিতায় এভাবে-
গোপনে স্রোত বয়ে যায়
গোপনে মাটি ক্ষয়ে যায়।
আর এই গোপন ঘটনা গুলোই আবার কেউ কেউ দেখে।
গোপন জলের ঢেউ
গোপনে আপন মনে
ঢেউ গোনে কেউ কেউ।
আসলে মানুষের যা জ্ঞাতব্য তার বেশির ভাগই তার কাছে গোপনই রয়ে গেছে। কারণ একটাই এটা বেশি জানাজানি বা কানাকানি হবার নয়।
সখি, ধরি তোদের চরন দ’ুখানি
জলের কথা কুলে যেন হয় না জানাজানি। (জ.প-১৭)
কবিতার নামই পাঠক কে কিছুক্ষন ঝঃরষষ করে রাখে যে, ‘নিশান ওড়ে কামরূপের ঘাটে’।
এই কবিতায় আমরা শুনতে পাব কত রকম মিথ্যা, মেকী, প্রবঞ্চনা তথা ভন্ডামীর আখ্যান। সবই তার প্রতিকী কথার অনবদ্য সরস ও গম্ভীর উচ্চারন। কখনো কখনো কবির তীব্র জ্বালাও ঝনিয়ে ওঠে।
কত জ্বালা বুকে কত বালা
ঝরা ফুলে কত মালা গাঁথেরে।
এই সুদীর্ঘ কবিতায় কবি সব প্রতিকুলতা ছাপিয়ে সাধনার জোড়ে মুক্তির দুর্গশিখরে বিজয় নিশান ওড়াবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। জীবনের পূর্নতার আহ্ববানে কবি প্রথাবদ্ধ ভ্রান্তির বাইরে নির্মল হওয়ায় প্রশান্তির পাল তুলেছেন।
প্রথাগত জীবনের ধর্মই স্বপ্নবুনন। আর এটাই জীবনের তাপ তথা ত্রিতাপ প্রসবিনী। কারন স্বপ্নই একমাত্র ভাঙ্গে। আর যখন ভাঙ্গে তখন সে তার তাপ রেখে যায়। আসলে স্বপ্ন মানুষ নিজে আয়োজন করে দেখে না তাকে কে যেন দেখায়। কিংবা সে অবচেতনে দেখে। কিন্তু সচেতন দেখাই দেখা আর সব ভেল্কি- অযথা। তাই কবির খেদোক্তি “কে জানে কতটা প্রথাগত -
কতটা মনমত,
আর কতটা যথাযথ পথে লোকে চলে।
প্রলয়াভাস সব ঐশী গ্রন্থের একটি ইঙ্গিত। আসলে জগতে চলছেই শুধু সৃষ্টি ও প্রলয়। মাঝখানে খানিকটা জীবন। জীবনের অবিরাম গতিময়তায় নিমগ্ন জীব নিবহ এই প্রলয়ের সংবাদ ভুলে থাকে। তাকে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা যুগে যুগে কবিরা করেছেন। কবিরা সবসময়ই ত্রাতার ভূমিকায় থাকেন। তারা সবসময়ই এই প্রলয়কে মানুষের বক্ষে ধারন করবার সাহস বা প্রেরনা যুগিয়ে যান। যাতে এই ক্ষয়িঞ্চু ও হৃতবীর্য মানুষ জীবনে স্থিত হতে পারে। এই অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের সংবাদ আমাদের সাহসী করে। আমাদের মনে রাখা দরকার-
পুরনো যন্ত্র বিকল হবে
পুরনো মন্ত্র বিফল হবে।
ঘুনে ধরা জীবনের বিস্বাদ ও বাস্তবতার বেড়াজাল থেকে বাইরে আনার আহবান কবির ‘পুষ্পবান’ সিরিজের কবিতাগুলোর মূল সুর। এটা যেন ‘আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’র নতুন অনুরনন-
আয় দুজনে কদম তলায়
জড়িয়ে ধরে গলায়
ব্রজের ধুলায় দিয়ে গড়াগড়ি
আয় দুজনে মিটিয়ে সাধ প্রানের আবাদ করি
আয় দুজনায় ঝাপ দিয়ে আজ মরি।
কেন্দ্রগামী বা কেন্দ্রস্থিত কবি জাহাংগীর খান ‘আমি কেহ নই’ কবিতার মাধ্যমে প্রকৃতির হাতে নিজেকে একেবারে সমর্পণ করেছেন। সব কিছুর কেন্দ্রে যিনি তাঁর অন্বেষণ বা আবিস্কারে ব্যপৃত কবির স্ববোধোক্তিÑ‘সব কিছুরই কেন্দ্রে তুমি, তুমিই আছো সকল কিছু ঘিরে’।
ভুল করে করে আমরা যে ভুলগুলো করে থাকি, কবি জাহাংগীর খান সেই ভুলের পদাবলি রচনা করেছেন তার ‘ভুল’ কবিতায়। এই সিরিজের কবিতাগুলো যখন আমরা পড়ি তখন দেখি আমাদের জীবন আপাদমস্তক ভুল দিয়ে মোড়া। গভীরার্থে ভুলই জীবনকে নির্ভূলভাবে এক ভূল গন্তব্যের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর মজার ব্যাপার হল আমাদের ভুলগুলোই আমরা ভুলে আছি। আর ভুলে ভুলেই জীবনের সুড়ঙ্গ রচনা করে মনের ভুলেই তার মধ্যে নিজেকে প্রবিষ্ট করাচ্ছিÑ কেমন যেন আঁধারের দিকে যাচ্ছি।
“ভুল তীরন্দাজ ভুল লক্ষ্যে
করেছে ভুল নিশানা
ভুল পথিকেরা জানে না
মূল ঠিকানা”
আর এই ভুলগুলোই জীবনে মিছেমিছির মজবুুত আবরন তৈরী করেছে। মিছে নিয়ে মিছেমিছি কানামাছি খেলার এই অনন্ত স্পৃহা আমাদের নিয়ে যাচ্ছে সত্যের বিপরীতে। অবিরল মিছের চর্চা আমাদেরকে সত্য ভুলিয়ে দিচ্ছে। আর মিথ্যাশ্রয়ী মানুষ আর যাই হোক আনন্দের সন্ধান পায় না। সত্য সচ্চিদানন্দ।
এই ‘মিছে’ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে দৈনন্দিন আচরন থেকে ধর্মাচরন পর্যন্ত বিস্তৃত। যার মাধ্যমে সত্যিই সত্যিই আমরা কল্যান প্রত্যাশা করে থাকি। মিছের ভিরে আমাদের মগজই বিভ্রান্তির ধাক্কায় দোদুল্যমান। মিছে কবিতায় মিছের সাতকাহন সত্যিই আমাদের জীবনে অনেক ভুলে থাকা মিছে কিংবা সত্য বলে মনে করে আসছি এমন ‘মিছে’র কথা মনে করিয়ে দেয়।
“মিছে দেবতার পূজার মিছে উপাচার
মিছে মুরতির ভীরে ছেঁড়ে মগজের তার”
প্রথাবদ্ধ জীবনের বাইরে সত্যিকার জীবনের হাতছানি কবির কাব্যপ্রেরণা। ‘কোথাও আমার হারিয়ে যাবার নেই মানা’র মত কবিও বলতে চাইছেন আটপৌরে জীবনের বাইরে মুক্তির পুষ্পিত অনাবিল আনন্দ নিকেতনের কথা। যেখানে জীবন ফিরে পায় প্রাণ। তাই কবির প্রত্যয়-
“নামিয়ে দেব অগ্নিদগ্ধ জলের তলে
শুদ্ধ জলের ঢল”॥
কিংবা-
ফুরিয়ে যাওয়া মধু
জুড়িয়ে যাওয়া ওম
আবার আনব ফিরিয়ে
কবরে কবরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে
নরকের আগুনে পুড়িয়ে পুড়িয়ে।
- Art
- Causes
- Crafts
- Dance
- Drinks
- Film
- Fitness
- Food
- Games
- Education
- Gardening
- Health
- Home
- Literature
- Music
- Networking
- Other
- Party
- Religion
- Shopping
- Sports
- Theater
- Wellness